মায়ের স্মৃতিতে সালমানের বেড়ে ওঠাঃ – দৈনিক মুক্ত বাংলা
ঢাকাসোমবার , ৩ এপ্রিল ২০২৩
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি-ব্যবসা
  3. আইন ও আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আরও
  6. ইসলাম ও ধর্ম
  7. কোভিট-১৯
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলা
  10. জেলার খবর
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. বিনোদন
  13. মি‌ডিয়া
  14. মু‌ক্তিযুদ্ধ
  15. যোগা‌যোগ
 
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মায়ের স্মৃতিতে সালমানের বেড়ে ওঠাঃ

সম্পাদক
এপ্রিল ৩, ২০২৩ ৬:০৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সুপন রায় ::

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ও ভালো ছিল। কোনো একটা বই, কোনো একটা কবিতা একবার পড়লে, একবার বলে দ্বিতীয়বার বলতে হতো না। প্লে গ্রুপে ভর্তি করানোর আগেই ইমনের প্লে গ্রুপের ছড়া এমনকি কেজি ওয়ানের পড়াগুলোও ছিল ঝাড়া মুখস্থ। ভর্তি করানোর আগে স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। পরিচয়-টরিচয়ের পর প্রিন্সিপ্যাল ইমনকে বসতে বললেন। সব ছেলেরা বসে গেলেও বসলো না। সটান দাঁড়িয়ে আছে দেখে প্রিন্সিপ্যাল বললেন, তুমি বসছো না কেন? শাহরিয়ার তুমি বসো। সে বললো, আমি ওখানে বসবো না । তখন প্রিন্সিপাল বললেন, তুমি কোথায় বসবে? সে বললো, আপনার সাথে টেবিলে। প্রিন্সিপ্যালের সামনেই তাকে বসানো হলো। তারপর শুরু হলো ভর্তি পরীক্ষা। সব ছেলেরা লিখছে। খাতা জমা নেয়ার পর দেখা গেলো পুরো খাতাটাই ওর খালি। একটি শব্দও লেখা নেই। নিজের ইচ্ছে মতো পাতায় আঁকাঝাকা করে ভরে তুলেছে। প্রিন্সিপ্যাল তাকে বললেন, শাহরিয়ার, তুমি তো কিছু লিখলে না। তোমাকে তো ভর্তি করানো যাবে না। ও বললো, কেন যাবে না?, প্রিন্সিপাল বললেন, কিছু লেখনি তাই। ও বললো, আমি তো সব জানি। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো। আমি যেটা জানি সেটা লিখে দেবো কেন? তারপর এক মিনিটে ইমন পুরো বইটা মুখস্ত বলে দিলো। প্রিন্সিপ্যাল তকে দিয়ে স্পেলিং লেখালেন। ঠিকঠাক মতো লিখতে পারায় ইমন তখন বললো, দেখেছ আমি পেরেছি। তখন প্রিন্সিপ্যাল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

মালেকা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার জন্যে ইমন সায়েন্স ছেড়ে কমার্স নিলো। গোলাগুলি, গন্ডগোলের ভয়ে ওকে আমি ভার্সিটিতে দিইনি। একদিন শ্যুটিং স্পট থেকে ও আইডেনটিটি কার্ড আনার জন্যে কলেজে গেলো, সুন্দর একটি গেঞ্জি পরে। প্রিন্সিপ্যাল নাকি তাকে বলেছেন, তোমাকে তো আইডেনটিটি কার্ড দেয়া যাবে না। তোমাকে ছাত্র মনে হচ্ছে না। দশ মিনিটের মধ্যে ইমন বাসায় ফিরে এলো। আমি তাকে বললাম, কি ব্যাপার তুমি কলেজে গিয়েছ, আবার এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছ। ব্যাপারটা কী? হাতে ছিল একটা শাদা শার্ট। জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কেন এনেছ? ও বললো, প্রিন্সিপাল বলেছে, ইউনিফর্ম না পরে গেলে আইডেনটিটি কার্ড দেবে না। আমি হাসলাম। ভাবলাম, প্রিন্সিপ্যাল যে মহিলাই হোক না কোন তাকে সম্মান করেত ইচ্ছে করে। এই বয়সী একটা ছেলেকে তিনি ফেরত পাঠাতে পেরেছেন। শাদা শার্টটা পরে ও মাথায় ঠেসে তেল লাগালো। ইমন মারা যাওয়ার পর সেই প্রিন্সিপ্যাল আমার বাসায় এসেছেন, কেঁদেছেন। বললেন, ওকে কোনোদিন আমি ভুলতে পারবো না। এমন বাধ্য ছেলে তো আমি দেখিনি। বললাম, আর ঠিকই ইউনিফর্ম পরে বাধ্য ছেলের মতো চলে এলো।

হাবিবুল্লাহ সাহেব (প্রাক্তন তথ্যমন্ত্রী) যেদিন সিলেট টিভি উদ্বোধন করলেন ঐদিনই বড়োদের আসরে আমার গানের প্রোগ্রাম ছিল বলে ইমনকে সাথে নিয়ে যাই। রুম ভর্তি শিল্পী। কোরাস গান হচ্ছে। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ইমন সবার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখে মঞ্চ থেকে হাবিবুল্লাহ সাহেব নেমে বললেন, ‘এই যে ছোটো শিল্পী এদিকে আস।’ কোলে নিয়ে বললেন, ‘বাচ্চার মা কোথায়?’ আমি কাছে যেতেই বললেন, ‘ছোটদের একটা গ্রুপ নিয়ে জাপান যাচ্ছি। আপনার বাচ্চাটাকে দিয়ে দিন।’ আমি বললাম, ‘ও এখনো ছোট। এতো ছোট বাচ্চাকে আমি কেমন করে দিই।’ তিনি বললেন, ‘অসুবিধা নেই। অভিভাবক হিসেবে একজন সাথে যাবে।’ এরপর হাবিবল্লাহ সাহেবকে ‘সোনা সোনা সোনা’ লোকে বলে সোনা, সোনা নয় যতো খাঁটি পুরো গানটি ইমন মুখস্থ গেয়ে শোনালো।
রেডিওতে একদিন ওকে সাথে করে নিয়ে যাই। ঢুকে দেখি বাচ্চাদের গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। প্রযোজক এসে আমাকে বললেন, ‘আপা, ইমনকে দিয়ে একটা গান গাওয়াইয়া দিই।’ আমি বললাম, ‘ইমন কি গান গাইতে পারবে?’ ইমনকে বলাতেই ও রাজি হয়ে গেলো। বললো, হ্যাঁ পারবো।
স্টুডিওর লাইট জ্বলে উঠলো। আমি ওকে নিয়ে ঢুকলাম। যন্ত্রীরা প্রস্তুত। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, ‘আমাকে স্ক্রিপ্ট দাও’। ভাঁজ করা বিরাট এক কাগজ তাকে দেয়া হলো। সে ভাঁজটা খুলে বড়ো করে হাতে নিলো। (বড়ো হওয়ার অদম্য আকাঙ্খা ছোটবেলা থেকেই তার ছিল। বাসায় সবসময় ও বড়ো জুতাগুলো পায়ে দিতো। আমার জুতা পরে ও বলতো, মামণি, তোমার জুতা পরলাম। ওর আব্বার জুতা পরে বলতো, আব্বুজি পরলাম) বললো, ‘মামা’ ছোট করে দিয়েছ কেন? বড়ো করে দাও।’ ফেরদৌস ওয়াহিদকে ইমন তখন খুব পছন্দ করতো। ফেরদৌস ওয়াহিদকে অনুকরণ করে ও দাঁড়ালো। মিউজিককে উল্টা ও ইশারা করলো শুরু করতে। মিউজিক চলছে। ইমন গান করছে। মিউজিক এক জায়গায় থামতেই ‘প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’ গাওয়া শুরু করলো। আগাগোড়া কোথাও কোনো ভুল হলো না। আমি অবাক হয়ে দেখলাম! কেমন করে সম্ভব!

হঠাৎই হানিফ সংকেত একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। বললো, ‘ভাবী, ড্রাগের উপর একটা গান ছিল। আপনি আর ইমন অভিনয় করলে খুব ভালো হবে।’ বললাম, ‘হঠাৎ করে গান গাইবার, ফিল্ম বানাবার ভূত চাপলো কেন?’ হানিফ বললো, ‘আমার খোমাটাতো ভালো না, মানুষে দেখবার চায় না। হেই লাইগ্যা খোমাটা আপনাগো চালামু আর গান খান আমার চলবো’। খুব হেসেছিলাম ওকে নিয়ে, ওর কথা নিয়ে।
গানের চিত্রায়নটা ছিল ড্রাগ আসক্ত বখে যাওয়া একটি ছেলের ওপর। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে যে এক সময় খারাপ হয়ে যায় এবং শেষে ছেলেটা মারা যায় (এই গানটা নিয়েয় রওশন এরশাদ আমেরিকায় গিয়েছিল এবং প্রাইজও পেয়েছিল)। আমার এখনো মনে পড়ে, সে সময় অনেকে আমাকে বারণ করেছিল। আমি শুনিনি। কিন্তু সেই দৃশ্যটাই ফলে গেলো। ভুলেও কোনোদিন ভাবিনি এরকম হয়ে যাবে। মনে যদি কোনোদিন এতোটুকু সন্দেহ জাগতো, হাজার চেষ্টা করলেও আমাকে দিয়ে কেউ এরকম একটা প্রোগ্রাম করাতে পারতো না।
মনে আছে, সেদিন প্রচুর কেঁদেছিলাম। আতিক ভই আমাকে বলেছিলেন, ‘নীলা, তোমার কি হয়েছে? এতো কাঁদছো কেন?’ কান্না থামানোর জন্যে আমি সেদিন রেকডিং রুম থেকে আতিক ভাই’র রুমে চলে গিয়েছিলাম।
গানের সিকোয়েন্সে আমি যখন ইমনের গায়ের ওপর পড়ে কাঁদছিলাম, তখন কাপড়ের নিচ থেকে কূট কূট করে হাসছিল। পরে এ জন্যে তাকে মারও দিয়েছি। ও তখন বললো, ‘আমি কি করবো? তুমি আমার গায়ের ওপর কাঁদছো। আমার সুড়সুড়ি লাগছিল।’ সাংঘাতিক রকমের সুড়সুড়ি রোগ ছিল ইমনের।

টিচারের কাছে বাইরে পড়তে যেতো বলে মাঝেমধ্যেই ওর দেরি হতো। হয়তো একটু-আধটু আড্ডা মারতো বন্ধুদের সাথে। আমি রাগ করবো বলে আমাকে খুশি করার জন্যে পায়ের মাঝখানে বসতো। পা ফাঁকা করে বসে বলতো, ‘তেল দিয়ে দাও।’ চুলের ফাঁকে ঘষে ঘষে তেল লাগানোতে ও খুব মজা পেতো, বিয়ের পরও আমার কাছে লাগাতে বসতো। গত ৪ বছর এরকম কতো স্মৃতি যে আমি মিস করেছি। আমার ভেতরটা কুড়ে খাচ্ছে।
ইমনের জন্ম হয় সকাল ৭টা ১০ মিনিটে (১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭০)। সে কি কষ্ট! মনে হলো, আমি বোধ হয় আর বাঁচবো না। দু’ মিনিট পরেই দেখলাম, কোনো কষ্ট নেই। আমার চাচী হাসছে। বললো, ‘কিরে, কাঁদবি না আর?’ ঐ চাচীকে ইমন ডালিং বলতো। আমি চাচীকে বললাম, কি হয়েছে? আমার কষ্ট চলে গেলো কেন? চাচী বললো, ১১ পাউন্ড ওজন। মাথাভর্তি চুল। নাদুসনুুদুস। গলার মধ্যে কি যেন প্যাঁচানো। বললাম, গলার মধ্যে ওটা প্যাঁচানো কোলে তুলে দেয়া হলো।
বাচ্চাটা ড্যাব ড্যাব চোখে আমার দিকে তাকাল। কি দেখলাম, কি বুঝলাম জানি না। বেলা বাজে তখন আড়াইটা। আব্বা এসে আমাকে বললেন, ‘ঘর-দুয়ার ঝকঝকে তকতকে। মনে হচ্ছে না যে এই বাড়িতে একটা বচ্চার জন্ম হয়েছে। নোংরাপনা নেই।’ মানুষজন আসতে শুরু করলো। চাচী-নানীরা কাপড়-চোপড় দিতে লাগলো। অল্পক্ষণেই অনেক টাকা-পয়সা উঠে গেলো। ৫০/৬০ টি মুরগি কেটে পোলাও রোস্ট রেঁধে সারা বাড়ির মানুষজনকে খাওয়ানো হলো।

© সুপন রায়, সাংবাদিক ও সালমান শাহ্‌’র অজানা কথা বইটির লেখক

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।