অশোক মজুমদার।।
গুটিগুটি পায় জয়া বচ্চনের কাছে গিয়ে বললাম, “জয়াদি অমিতাভজী আর মিঠুনের পাশে একটু দাঁড়াবেন? একটা ছবি তুলব।”
কথাটা শুনেই জয়াদি হেসে বললেন, “ওই ঢেঙ্গা ঢেঙ্গা লোকগুলোর মাঝে আমায় দাঁড়াতে বলছেন ? একবার ভেবেও দেখলেন না, ওদের মাঝখানে দাঁড়ালে আমায় কেমন লাগবে। উফ আপনারা পারেন বটে ! ওদের অনুষ্ঠান, আমি এমনি এসেছি। নানা আমি দাঁড়াবো না।”
তাজ বেঙ্গল না গ্র্যান্ড হোটেল ঠিক মনে পরছে না। যেমন মনে নেই ডেট ও সাল।বহুদিন আগে আমাদের বাংলার জামাই অমিতাভ বচ্চন এবং বাংলার ছেলে মিঠুন চক্রবর্তী সহ একটা অনুষ্ঠানের জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। দুজনেই তখন বলিউডে এক নম্বর আর্টিস্ট। তাদেরই এক প্রেস কনফেরেন্স কভার করতে যাই আমি।
দূরে জয়া বচ্চনকে দেখে মনে হলো অমিতাভ ও মিঠুনের সাথে জয়াদির যদি একটা ছবি তোলা যায় তাহলে তিনজন এক ফ্রেমে বেশ ভালো হবে। কিন্তু জয়াদি অনুরোধ শুনেই নাকচ করে দিলেন।
জয়া বচ্চনের মত সেলিব্রেটিদের বারবার অনুরোধ করা যায়না। কি করি এখন ?পাত্তা না পেয়ে টেলিগ্রাফের মুখ্য চিত্র সাংবাদিক আলোক (দা) মিত্রকে বলি, “আলোকদা আমি একবার বলেছি। আপনি জয়াদিকে একবার বলুন, তিনজনের একসঙ্গে ছবি তুললে খুব ভালো একটা ফ্রেম হবে।”
আলোকদা বলল, “বলছিস ?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, তুমি সিনিয়র ফটোগ্রাফার। তুমি বললেই হবে।”
কথা শেষ হতে না হতেই অলোকদা আমাকে নিয়ে জয়া বচ্চনের কাছে গিয়ে বৌদি সম্মোধন করে বললেন…..”একটিবার চলুন। এই ছবিটা আমাদের পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতায় আপনাদের এক সাথে পাওয়া খুব মুশকিল।”
এই কথার ভিতরেই মধ্যে মিঠুন জয়াদিকে কিছু একটা বলতে আসে। সুযোগ পেয়ে আলোকদা আমি দুজনেই মিঠুনকে ছবিটার কথা বলি।
মিঠুনদা জয়াদির হাত ধরে আমাদের কথায় সায় দিয়ে বলে, “চলো চলো। ওদেরও তো কিছু ছবি দরকার।”
জয়াদির হাত ধরে মিঠুনদা অমিতাভজির।কাছে নিয়ে যায়। তারপরেই মিঠুনদা জয়াদিকে মাঝখানে রেখে অমিতাভ বচ্চনের বাঁ হাতটা জয়াদির মাথার ওপরে নিজের হাত দিয়ে তুলে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে আমরা অনেকগুলো ছবি ক্লিক করে নিই।
এই ছবি যখন তোলা হয় আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে এই তিন বলিউড মহান শিল্পীর কোন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু পরে মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে সাদা বাড়ির কালো গ্রিল (আনন্দবাজার পত্রিকা) কলকাতার পাতায় ছবি তোলার সময় সম্পর্কটা দৃঢ় হয়। এমনকি কলকাতায় এলে মিঠুন চক্রবর্তীর ব্যক্তিগত ফোনে যোগাযোগ করে বহু ছবি আমার অনুরোধে আগেই করে দিয়েছে। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মিনিট মেপে ওনার অ্যাপয়েনমেন্ট পাওয়া যেত।
কিন্তু আজ বলতে দ্বিধা নেই যে আমার অত্যন্ত সৌভাগ্য যে বর্তমানে বলিউডের শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চন আমাকে দেখলেই চিনে নেন। কুশল বিনিময় করেন।
এটা সম্ভব হয়েছে কলকাতার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সময় নেতাজি ইন্ডোরের সাজঘরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছবি তোলার সময় আমায় অমিতাভজী বছরের পর বছর দেখে চিনে গেছেন।
প্রতিবারই চোখাচোখি হলেই প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেন, “আপ ক্যায়সে হ্যায় ?”
কখনো কখনো বাংলায়, “আপনি কেমন আছেন?”
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে দুজন স্টিল চিত্রসংবাদিক এবং একজন ভিডিও ফটোগ্রাফার থাকেন। অমিতাভজী যাই করুন না কেন তারা সেইসব দৃশ্য ধরে রাখেন।
একবার কি হয়েছে….নেতাজি ইনডোরে দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ অফিসার ওনার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফারদের সাজঘরে ঢুকতে বাধা দেয়। একথা অমিতাভজীর কানে আসতে উনি নিজেইর মেনগেটে দাঁড়িয়ে পুলিশ অফিসারদের বলেন যে, “ওরা আমার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার। ওদেরকে আটকাবে না।”
এটা দেখে এবং শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল।
আমি সাজঘরে থাকার সময় বাংলার বহু শিল্পী, প্রশাসনিক ও পুলিশ অফিসারদের ছবি তোলার অনুরোধ মেটাই। স্বাভাবিক সেটা। দু’ফুটের ভেতরেই যদি বলিউডের শাহেনশাহ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, গুছিয়ে বাংলায় কথা বলছেন, মজা করছেন….তাহলে তারসঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ কেইবা ছাড়বে ?
এদের দলে শুধু ব্যতিক্রম আমি। ফটোগ্রাফি পেশায় এসে বহু দেশ বিদেশের সেলিব্রেটি , ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীর মত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ছবি চিত্র সাংবাদিক সহ অনেকেরই তুলে দিলেও ব্যক্তিগতভাবে নিজে ছবি তুলিনি। আমার কখনো ভিভিআইপিদের সঙ্গে নিজের ছবি তোলার কথা মনে হয় নি।
তবে সত্যি বলতে এখন মাঝেমধ্যে মনে হয়, “ইস একটা ছবি তুলে রাখলে ভালো হত…..”
আসলে তখন ভাবিনি যে মোবাইল আসার পরে ফ্যানেদের মত সেলিব্রেটিদের সঙ্গে সেলফি তুলে নিজেদের হনু প্রমাণ করতে হবে।
এবারের ২০২৩ এর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর একটা ঘটনা বলি….যা আমার পেশাগত জীবনে ঘটা অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত।
এবছর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নেতাজী ইনডোরের সাজঘরে অমিতাভজীকে একা সোফায় বসে থাকতে দেখে অনেকেই মোবাইলে ওনার সঙ্গে ছবি তুলছেন। আমাকেও এরকম দুজন অফিসারের অনুরোধ রাখতে হলো।
অমিতাভের বাঁদিকে একটু দূরে শত্রুগ্ন সিনহা ও তাঁর পাশে মহেশ ভাট বসেছিলেন। হঠাৎ অমিতাভ বচ্চন আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন, “আরে আপ সবকা পিকচার খিচ দেতে হো। মাগার আপকো ভি তো এক ফটো খিচনা হে।”…বলে প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরার জন্য হাত বাড়ালেন!!
আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে খুব লজ্জিতভাবে ওনাকে বললাম, “অমিতজী আপ বৈঠিয়ে। মে আপকে পাস নেহি ব্যাঠুঙ্গা”…. বলেই আমি ওঁর পায়ের কাছে নিচে মেঝেতে বসে পড়ি। ওই লম্বা দুটো হাঁটুর ঠিক মাঝখানে।
অমিতজী হেসে ওনার ডান হাত আমার কাঁধে রাখলেন। এই দৃশ্যটা অনেকেই মোবাইলে এবং ক্যামেরায় তুলেছিল। অস্বীকার করবো না অভিভূত হয়ে গেছিলাম।
আমি সাধারণ এক ছবিওয়ালা। বর্ধমানের গ্রাম থেকে কোনোভাবে এসে পরেছিলাম এই শহর কলকাতায়। পড়াশোনা করিনি তেমন। ভবিষ্যতের ভাবনায় নয় পেটের তাগিদে আসা এ পেশায়। ছবি তোলার কিছুই জানতাম না। দেখতে গেলে আজও শিখতে শিখতেই চলেছি। জানিনা কি কতটুকু কি করতে পেরেছি তবে যখন অমিতাভ বচ্চনের মত মানুষরা, ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞাসা করে তখন মনে হয় নিজের কাজটুকুর প্রতি কখনো অসন্মান না করার জন্য এই টুকরো ভালোবাসাগুলো আমার পরম প্রাপ্তি হিসেবে দিনের শেষে তৃপ্তি দেয় ভীষন।
আজ ছবিওয়ালার গল্পে জয়া বচ্চনের কথায় ঢেঙ্গা শিল্পীদের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার গল্পটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম।
সকলে ভাল থাকবেন। সুস্থ থাকবেন। সহজ ভাবনায় সমাজকে ভালোবাসবেন।
: অশোক মজুমদার ভারতীয় চিত্র সঅংবাদিক এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
০৮. ০৪. ২০২৩