শাহ মুহম্মদ সগীর : মানবীয় রোমান্টিকতার পথিকৃৎ – দৈনিক মুক্ত বাংলা
ঢাকাশনিবার , ৬ মে ২০২৩
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি-ব্যবসা
  3. আইন ও আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আরও
  6. ইসলাম ও ধর্ম
  7. কোভিট-১৯
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলা
  10. জেলার খবর
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. বিনোদন
  13. মি‌ডিয়া
  14. মু‌ক্তিযুদ্ধ
  15. যোগা‌যোগ
 
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শাহ মুহম্মদ সগীর : মানবীয় রোমান্টিকতার পথিকৃৎ

সম্পাদক
মে ৬, ২০২৩ ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

অ‌মিতাভ কাঞ্চন ::

শাহ মুহম্মদ সগীর মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতনামা কবি। তাঁর রচিত ইউসুফ-জুলেখা কাব্যে গৌড় সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের (১৩৮৯-১৪১০) স্বত্ততি আছে। এ থেকে তাঁর আবির্ভাব কাল চৌদ্দ শতকের শেষভাগ থেকে পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগ বলে গবেষকরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছেন। তিনি সম্ভবত সুলতানের সভাকবি ছিলেন এবং তাঁরই নির্দেশে এ কাব্য রচনা করেন। গ্রন্থের শুরুতে রাজস্ত্ততি ছাড়াও কবির পিতা-মাতা ও গুরুজনদের বন্দনা আছে; কিন্তু তাঁদের নাম বা আবাসস্থলের কোনো বর্ণনা আমরা খুঁজে পাইনি।
আমরা মোটামুটি জোর দিয়ে বলতে পারি, মুহম্মদ সগীরই প্রথম বাংলা ভাষার মাধ্যমে আরবি-ফারসি সাহিত্যের বিষয় এদেশের পাঠকের কাছে তুলে ধরেন। ইউসুফ-জুলেখার প্রেমকাহিনী পবিত্র কুরআনে আছে। ইরানের সুফি কবিরা এই কাহিনী অবলম্বনে ফারসিতে অনেক কাব্য রচনা করেছেন। যতদূর জানা যায়, ফেরদৌস ও জামী এঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন।
প্রাবন্ধিক ওয়াাকিল আহমদের ভাষ্যে, “ফারসি ইউসুফ-জুলেখা কাব্যে আধ্যাত্মিক প্রেমতত্তে¡র ব্যঞ্জনা আছে; কিন্তু বাংলা কাব্যে মানবপ্রেম প্রাধান্য লাভ করেছে। কাব্যের শেষে ইউসুফের দিগি¦জয় ও ইবন আমিন-বিধুপ্রভার প্রেমাখ্যান যুক্ত করায় কবির এরূপ মানসিকতা অধিকতর প্রকাশিত হয়। অংশটি সম্পূর্ণ কবির কল্পনাপ্রসূত।”
কবি শাহ মুহাম্মদ সগীরের ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না। তাঁর লোকান্তরিত হওয়ার আনুমানিক পাঁচ ছয় শত বছর পর আমরা তাকে নিয়ে আলোচনা করছি। সময়টি বেশ দীর্ঘ। আমার বিশ্বাস আজ থেকে এক শতাব্দী পূর্বেও যদি তাঁকে নিয়ে উল্লে¬খ্য গবেষণা হতো; তবে আরো অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যেত। নিদেনপক্ষে কবি সৈয়দ আলী আহসান এবং মো: আবদুল হাই বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত রচনা সময় যদি তাঁর ব্যাপারে আগ্রহী হতেন। তাহলেও তাঁর ব্যাপারে হয়তো আরো ব্যাপক তথ্য বেরিয়ে আসতো। বস্তুত তা হয়নি। উনারা কেবল ইংরেজ শাসন আমল থেকে তৎবর্তমান পর্যন্ত গ্রন্থিত করেই ক্ষান্ত হয়েছেন। ফলত: একজন অনন্য অসাধারণ কবি সম্পর্কে অনেকটাই বেখবর আমরা।
তবে উনার রচনা নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। প্রথমে ইউসুফ জোলেখ প্রসঙ্গে চলি। যে সব খ্যাতনামা ফারসী কবি ইউসুফ জোলায়খার প্রণয় অবলম্বন করে কাব্যোপাখ্যান লিখেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রধান ইরানের মহাকবি ফেরদৌসী [ মৃত্যু ১০২৫খ্রিঃ ] এবং সুফী কবি জামী [ মৃত্যু- ১৪৯২ খ্রিঃ]। মূল কাহিনী প্লাবিত করে তাঁরা ইউসুফ জোলেখা নামে কাব্য রচনা করেছিলেন। ফেরদৌসীর কাব্য ছিল রোমান্স জাতীয় এবং জামীর কাব্য ছিল রূপক জাতীয়।
অনেকের ধারণা, বিখ্যাত মোল্লা আবদুর রহমান জামী ও শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যের কাহিনী সুপ্রাচীন ফারসী প্রণয় কাহিনী থেকে গৃহীত। আবদুর রহমান জামী ১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ফারসী ভাষায় তাঁর অমর কাব্য ‘ইউসুফ জোলায়খা’ রচনা করেন। সেই কাব্যের অনুসরণে শাহ্ মুহম্মদ সগীর দেশীভাষে তার ইউসুফ জোলেখা প্রণয়ন করেন। কিন্তু শাহ মুহাম্মদ সগীর কাব্যভাষা গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে উপরোক্ত বক্তব্যের ভিন্নতা পরীলক্ষিত হয়। কবির ভাষায়-
‘ইছফ-জলিখা কেচ্ছা কিতাব প্রমাণ।
দেশী ভাষে মোহাম্মদ ছগিরী এ ভান ।।’
মূল কাহিনী প্লাবিত করে ইউসুফ-জোলেখা নামে যারা কাব্য রচনা করেছিলেন। তাদের কাব্যের সাথে শাহ মুহম্মদ সগীরের কাহিনীর তেমন কোন মিল নেই। তবে ফেরদৌসীর কাব্যের রোমান্টিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শাহ মুহম্মদ সগীরের কাব্যের যথেষ্ট সামঞ্জস্য বিদ্যমান। এই প্রসঙ্গে ডঃ মুহম্মদ এনামুল হক অনুমান করে বলেন, “কুরআন ও ফেরদৌসীর কাব্য ব্যতিত মুসলিম কিংবদন্তিতে স্বীয়-প্রতিভায় নির্ভর করিয়াই শাহ মুহম্মদ সগীর তাহার ইউসুফ-জোলেখা কাব্য রচনা করেছিলেন”। কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যে মর্ত্যমানবের বেদনার যে সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে, অষ্টদশ শতাব্দীর কাব্য সাধনায় মানবতার নব-উদ্বোধন তারই বিবর্তিত রূপ।’
‘ইউসুফ জোলেখা’ই বাংলা সাহিত্যে প্রথম মর্তলোকের মানুষের আকাংখা তথা সাধারণ জীবনের উৎসারণের সম্ভাবনাকে উন্মুখ আহবানে অভিষিক্ত করলো। বাংলাতে ইউসুফ জোলায়খা কাব্যের আদি রচয়িতা যে শাহ্ মুহাম্মদ সগীর তা নিয়ে বিতর্ক নেই। আমরা দেখতে পাই, শাহ মুহম্মদ সগীরের কাব্যে প্রেম রসে ধর্মবাণীর পরিবর্তে প্রেম রসে মানব বাণী প্রচার মুখ্য হয়ে উঠছে। তিনি প্রেমরস অবলম্বনে ধর্মবাণীর প্রচার করতে চাইলেও তা কাব্যে মানবীয় প্রেমকাহিনী হিসাবে রূপলাভ করেছে। ‘কাব্যে দেখানো হয়েছে রূপজমোহ পার্থিব ভোগতৃষ্ণার বিষয়। ইন্দ্রিয় সম্ভোগবাসনা দ্বারা অতীন্দ্রিয় পরমাত্মাকে পাওয়া যায় না, অন্তরের প্রেম দ্বারাই তাকে পাওয়া সম্ভব। বিচ্ছেদের মধ্যে ত্যাগ-তিতিক্ষার দ্বারা জোলেখা যেদিন সেই প্রেম সাধনায় জয়ী হয়েছেন, সেদিন পরমাত্মা নিজেই এসে ধরা দিয়েছেন। উভয়ের মিলন হয়েছে।’

‘ইউসুফ জোলায়খা’ রোমান্টিক কাব্যোপাখ্যান হওয়া সত্তে¡ও, কবি তার বর্ণনাভঙ্গিতে পরিচিত সমাজ ও সংসার জীবনের বন্ধনকে স্বীকার করেছেন। শাহ মুহম্মদ সগীর তার রচনায় মুসলিম বিশ্বাস ও জীবনাচরণের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় দারুণ ভাবে। তিনি যখন বলেন :
ইছুফে বলিলা দুই বাধা অছে বড়।
আজিজক ভয় আর নিরঞ্জন ডর\
আজিজক কৃপাণ শমন সমসর।
শিরছেদ করিয়া পাঠাইব যমঘর\
ধর্মেতে বিরোধ হয় এহি আর ভয়।
পরলোকে নরকে ডুবিব অতিশয়\
তখন যে ধর্ম বিশ্বাস ও পাপ-পূণ্যবোধের বাণী উচ্চারিত হয় তার সাথে মুসলিম জীবন দর্শনের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। যেজন্যই বোধ হয় এই রচনা সম্পর্কে ডঃ ওয়াকিল আহমদ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ‘মুহম্মদ সগীর কুরআনকে ভিত্তি করে ইসলামি শাস্ত্র, ইরানের আধ্যাত্মিক কাব্য ও ভারতের লোক কাহিনীর মিশ্রণে ইউসুফ জোলেখা কাব্যের পূর্ণাঙ্গ কাহিনী নির্মাণ করেছেন।’ কিন্তু ভাষাবিদ,গবেষক ড. এনামুল হক বলেছেন ভিন্ন কথা। তাঁর মতে, শাহ মুহম্মদ সগীর সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘‘ইউসুফ জুলেখা’’ কাব্য রচনা করেন। কবি ‘‘ইউসুফ জুলেখা’’-এর মূল কাহিনী সংগ্রহ করেন ‘‘কিতাবুল কোরান’’ থেকে। কিন্তু কাব্যখানি ধর্মীয় উপাখ্যান নয়, রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান যা মানবজীবন রসে সিক্ত। শাহ মুহম্মদ সগীর মূলত কোরানে বর্ণিত ইউসুফ জুলেখাকে নতুন করে রক্ত-মাংস সংযোগ করে এক মোহনীয় মূর্তি সৃজন করেছেন। আমারাও এখানে ড. এনামুল হকের মতটিকেই সমর্থন করছি। কেননা, কবির অন্য রচনাগুলো পাঠ করলেও আমরা এই মতের প্রমাণ পাই। বন্দনা কবিতায় শাহ মুহম্মদ সগীর লেখেন-
‘প্রথমে প্রণাম করি এক করতার
যেই প্রভুর জীবদানে স্থাপিলা সংসার।
দ্বিতীয়ে প্রণাম কঁরো মাও বাপ পাত্র
যান দয়া হন্তে জন্ম হৈল বসুধায়
পিঁপড়ার ভয়ে মাও না থুইলা মাটিতে
কোল দিয়া বুক দিয়া জগতে বিদিত।
অশক্য আছিলুঁ দুর্বল ছাবাল
তান দয়া হন্তে হৈল এ ধড় বিশাল।।
না খাই খাওয়াএ পিতা না পরি পরাএ।
কত দুক্ষে একে একে বছর গোঞাএ।।
পিতাক নেহায় জিউ জীবন যৌবন।
কনে না সুধিব তান ধারক কাহন।।
তাঁর সব রচনা পড়ে এই কথা দায়িত্ব নিয়ে বলা যায়, বাংলাসাহিত্যে মানবীয় রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান ধারার পথিকৃৎ হলেন শাহ মুহম্মদ সগীর। তাঁর সকল লেখায় পাওয়া যায় মানবিক হিতোপদেশ। যেমন এই কাব্যের আরেকাংশে তিনি এভাবে লিখেছেন –
‘ওস্তাদে প্রণাম করো পিতা হন্তে বাড়।
দোসর-জনম দিলা তিঁহ সে আহ্মার।।
আহ্মা পুরাবাসী আছ জথ পৌরজন।
ইস্ট মিত্র আদি জথ সভাসদগগণ।
তান সভান পদে মোহার বহুল ভকতি।
সপুটে প্রণাম মোহর মনোরথ গতি।।
মুহম্মদ সগীর হীন বহোঁ পাপ ভার।
সভানক পদে দোয়া মাগোঁ বার বার।’
তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের দেশি ভাষার সাহায্যে মুসলিম ধর্মীয় প্রণয়োপখ্যানে সিক্ত করা এবং বাস্তবতা বর্জিত পুঁথিসাহিত্য থেকে পাঠককে প্রকৃত সাহিত্য রসে ফিরিয়ে আনা। আমরা আশা করি, আমাদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ইতিহাসের সমৃদ্ধির স্বার্থে কবি শাহ মুহাম্মদ সগীরের জীবন এবং কর্ম নিয়ে আরো ব্যাপকতর গবেষণা হবে। তা হওয়া উচিতও বটে।।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।